Breaking News
Home / সম্পাদকীয় / ভেজালের মধ্যে ভেজাল

ভেজালের মধ্যে ভেজাল

আমার  মতে কম খাবারে কম ভেজাল; আর তাতেই তাঁর দৃষ্টিতে বেঁচে যাওয়া।  অর্ধজীবন পার না করতেই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।  যখন কলেজে পড়ি তখন এক বন্ধুর সাথে খুব ভাব হয়েছে আমার। সে ছিলো আমার জানের দোস্ত। ফুসফুসে ক্যান্সারে প্রাণের দোস্তটা সেদিন মারা গেছে। ৮০ ভাগ লিভারই নাকি নষ্ট হয়ে গেছে । খাদ্যে ভেজালের জন্যই এমন হচ্ছে। ভেজালে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ। বোধ করি খাদ্যে এমন ভেজাল আর কোনো দেশে নেই। ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়! আমিও ক্যান্সারে আক্রান্ত নইতো? পরিবারের সদস্যরা ভালো আছেনতো?

পাঠক আপনারাই বা কতটা সুস্থ্য আছেন?

সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি আপনারা সুস্থ্য থাকুন। কিন্তু যেভাবে ভেজাল খাবার খাচ্ছেন তাতে কতদিন সুস্থ্য থাকবেন? এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইন্সিটিউট তিন বছরের খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ওলিংগং বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গবেষণা জরিপ করে দেখেছে যে,দেশের মোট খাদ্যের ৩০ শতাংশে ভেজার রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ৬৬ শতাংশ রেস্তোরারর খাবার, ৯৬ শতাংশ মিষ্টি, ২৪ শতাংশ বিস্কুট, ৫৪ শতাংশ পাউরুটি, ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। এসব খেয়ে দেশের মানুষ আর সুস্থ্য নেই। গোটা দেশটাই অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে।

মাঝে মাঝে ভাবী, দেশে এসব কী হচ্ছে । সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না তো?  খাবারে ভেজালের জন্যই এমন হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? মাছ, ফলমূল, তরকারিতে কোথায় নেই এই জীবনহন্তারক ফরমালিন। তেলে ভেজাল, এমনকি নুনেও ভেজাল। কেউ কেউ তো বলেনই বিষেও নাকি ভেজাল। তাই যা হওয়ার নয়, তাই হচ্ছে। কিডনি নষ্ট হচ্ছে, ক্যান্সার আর হার্টস্ট্রোকে অহরহ মানুষ মরছে। আমাদের অতি আদুরে সন্তানরা অকালে ঝরে যাচ্ছে এসব অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে। সব খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষ। আর সেই বিষ খেয়ে আমরা আর বেঁচে নেই। জীবিত থেকেও লাশ হয়ে গেছি। এ যেন জিন্দা লাশ! রোগে-শোকে কয়েকটা দিন বেঁচে থাকা এই আর কি। প্রতিনিয়তই তো বিষ খাচ্ছি। আমরা প্রতিজনে, প্রতিক্ষণে, জেনে শুনে  বিষপান করেছি । কত কিছু খাই; ভস্ম আর ছাই।’ তাইতো খাচ্ছি আমরা। আর এ বিষ খেয়ে দেশের মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

গবেষণা সূত্রে প্রকাশ, রাসায়নিক ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন দুই লাখ মানুষ। দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছে ১৭ জনের বেশি রোগি। বছরে মারা যাচ্ছে দেড় লাখ মানুষ। আর ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতি বছর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ। দেশে দুই কোটিরও অধিক লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় অকালে মারা যাচ্ছে পাঁচজন। প্রতি বছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে ৫ লাখ। বৎসরে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়  ভেজাল খাদ্য।

এমন চিত্র কতইনা ভয়ংকর !  ভেজাল খাদ্যের কারনে আমাদের জীবন এখন প্রায় খাদের কিনারে। এখনও কি আমরা আর ঘাপটিমেরে বসে থাকতে পারি? যারা বিবেকবান তারা অন্তত চুপ করে থাকার কথা নয়। আমরা জানি, বিষ খেয়ে মানুষ মরছে; চুপ করে কি করে থাকি? যারা ভেজাল খাবার মুক্ত দেশ গড়ার ক্ষমতা রাখেন তারা কি করে চুপ থাকতে পারেন? মনে রাখবেন, আপনি, আমি, আমরা, আমাদের সন্তান, পিতা-মাতা, স্বজন কেউ এখন আর নিরাপদ নন। সব কিছু শেষ হয়ে যাবার আগেই আমাদের ভাবতে হবে। প্লিজ, প্লিজ আপনারা দেশের ও দেশের মানুষের জন্য জন্য কিছু করুন। তা -না -হলে যে, সৃষ্টি কর্তার দরবারে আপনারা একদিন জবাবদিহি করতেই হবে।

‘মাছে-ভাতে বাঙালির মাছে ফরমালিন আর ভাতের চালে প্রাণ-ঘাতী ক্যাডমিয়াম! বাঙালি মাছ-ভাত খেয়েই বাঁচে। সে জায়গায়ও বিষের ছড়াছড়ি। খাদ্য যদি ভেজাল হয় তাহলে দেশের মানুষ কী খাবে? এ দেশে নিরাপদ খাবার আদৌ কি আছে? কেবল মাছ-ভাত নয়, সব খাবারই তো ভেজালে ভরা। ভেজাল খেয়ে গোটা জাতির বহু মানুষ আজ রোগে আক্রান্ত।  তাই ভেজাল খাদ্যে ভরে গেছে দেশ। আমরা যা খাচ্ছি তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রের প্রশ্ন ছিল এমন- ‘বাবা! কচুতে মাছি, ফলে নেই কেন?’ বাবার কাছে প্রশ্নটা করলেও উত্তরটা কিন্তু তার ঠিকই জানা। লোভনীয় ফলে মাছি ভন্ভন্ করার কথা কিন্তু কোথাও মাছি নেই। সে জানে বিষাক্ত ফরমালিন আর কার্বাইডের কারণে মাছিরা উধাও। পত্রপত্রিকা আর টিভি দেখে সে এসব জেনেছে। তাই বাবার কাছে ছেলের এমন রহস্যজনক প্রশ্ন। পিতা এ প্রশ্নে কি উত্তর দেবেন? ঐ শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জবাব দিতেও বিব্রত পিতা।

খাদ্যে ভেজাল মানে তো বিষ খাওয়ানোর শামিল। হত্যাকান্ডের মত বিষয়। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা আইন থাকলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন নেই কেন? ভেজালের ব্যাপারে যথাযথ আইন প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক এক গবেষণার তথ্য মতে, এদেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি খাবারে ভয়ংকর সব রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। যারা ভেজাল মেশায় তাদের ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। খাদ্যে ভেজাল জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। সেই সঙ্গে অপরাধীদের ধরে সাজা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রন করতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।

Check Also

পেঁয়াজের দাম লাগামছাড়া, সমাধান কোথায়?

সম্পাদকীয় হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। কিছুদিন আগে যে পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *